গ্রামবাংলার কিশোরীদের প্রিয় খেলা পুতুলের বিয়ে বিলুপ্ত প্রায় 

রতি কান্ত রায়, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: :
সভ্যতার ত্রুমবিকাশ আর আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্ত প্রায় কিশোর ও কিশোরীদের পুতুল খেলা। বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে পুতুল খেলা খেলেনি এমন মেয়ে খুজে পাওয়া মুশকিল।
গ্রামবাংলায় বিভিন্ন মেলা যেমন রথের মেলা, বৈশাখী মেলা, শিবরাত্রি, দশহারার মেলা , পৌষ সংত্রুান্তি ও নানা পাবর্ণে হরেক রকমের পুতুল পাওয়া যেত এখন প্লাস্টিকের পুতুলেরও চল হয়েছে।
অবুঝ অতিথীয়তার খেলায় মেতে উঠতো এক সময় গ্রামের সহজ সরল কিশোর ও কিশোরীরা । কল্পনা থেকে বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার প্রতিভাই হচ্ছে পুতুলের বিয়ে খেলা ।কোমল হাতের পরশে দর্জির কাছ থেকে টুকরা কাপড় দিয়ে  তৈরি করে ছেলে- মেয়ে বর- কনে নতুবা কলার গাছের ডোগোল দিয়ে তৈরি করতো।
রান্না-বান্না, সন্তান লালন- পালন মেয়ে পুতুলের সাথে ছেলে পুতুলের বিয়ে ইত্যাদি নানা বিষয়ের অভিনয় করে খেলা হতো পুতুল খেলা। অাসলে পুতুল খেলার মধ্যে পুরো সংসারের একটা প্রতিছবি ফুটে ওঠে।
পুতুলগুলো যেন ছোট-ছোট সোনামনিদের সন্তান। মায়ের মতোই স্নেহ অার অাদর দিয়ে খাওয়া থেকে শুরু করে ঘুম পাড়ানো পর্যন্ত সব কাজই করে খুকুমনিরা। কেবল মাত্র অাদর- সোহাগই নয় প্রয়োজনে শাসনও করে  তাদের পুতুল সন্তানকে।
মিছেমিছি বিয়ে খেলায় ব্যস্ত গ্রামীন সরলা বনিতা। নিজেদের মতো করে পছন্দের খেলার সাথীর পুতুলের সাথে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় ঘটকের মাধ্যমে ।প্রথা অনুযায়ী বর বা কনে পক্ষের বাড়িতে সওদা পাঠান ।অবুঝ কিশোর -কিশোরীদের মধ্যে অতিথীয়তার মান অভিমানও সৃষ্টি হয় ।
পরম আত্মীয়তার সম্পর্কের বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে গ্রামের কোমল মতি ছেলে-মেয়ে। আর এ সম্পর্কের টানে জড় বস্তুর প্রেমে আকৃষ্ট হয় জীবজগৎ।
জীবন জগতে প্রত্যেক জীব বৈচিত্র্যময় সম্পর্ক জালে আবদ্ধ। কেউ সাজে পুতুলের মা আবার কেউবা বাবা। মাসি-পিসি,ভাই-বোন,ননদি-দেবর,শ্বশুর-শ্বাশুর সকলেই মমতাময়ীর ভুমিকায় অবতীর্ণ হয় ।
গর্ভ ধারনী মা ও বাবার মত কর্তব্য পালন করেন পুতুলের বাবা-মা। পুতুলকে বিবাহ দেওয়া থেকে যাবতীয় কর্তব্য পালন করে ।
এই মিছেমিছি সম্পর্কের খেলায় গড়ে ওঠে গ্রাম-গ্রামান্তরের ছেলে-মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব পূর্ণ গভীর সম্পর্ক। যা জাতি ধর্ম-বর্ণ  গন্ডি ভেঙ্গে চুরমার করে।ফলশ্রুতিতে পৃথিবী ভরে উঠে  অতিথীয়তার   লালন ভুমিরুপে।
আধুনিক সমাজে ছেলে-মেয়েরা জন্ম থেকে পরিচিত হয়ে উঠছে যন্ত্রের সাথে। অাজকাল বাচ্চারা ছোট বেলা থেকেই মোবাইলে গেম খেলে বিভিন্ন ধরনের মোবাইল গেমের সঙ্গেই বেশী পরিচিত হচ্ছে এবং হরেক রকমের মোবাইল গেমের খেলা মুখস্ত হতে বেশী সময় লাগেনা তাদের। তারা যেন মোবাইলে গেম খেলে সবচেয়ে বেশী অাত্নতৃপ্তি পায় । তারা হয়ে উঠেছে নিষ্ঠুর প্রতারক এক যন্ত্র, নেই কোন মানবতা যেন এক কাঠের পুতুল। কারো কষ্টে তাদের মন গলেনা এর চেয়ে বোধয় পুতুল খেলার হারানো দিনগুলো অনেক ভাল ছিল, দিনগুলো এতো নিষ্ঠুর ছিলনা সহজ সরল ছিল প্রতিটা বাচ্চার মন। সামান্য পুতুল ভেঙ্গে গেলে তারা কেঁদে ফেলতো পুতুলের মায়ায়, তাই পল্লী কবি জসীম উদ্দীন তার কবর কবিতায় লিখেছেন এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ, পুতুলের বিয়ে ভেঙে কেঁদে ভাসাইত বুক।   যান্ত্রিক খেলনা শুধু শিশুকে নিষ্ঠুরতাই শিক্ষা দেয় না, কেড়ে নেয় সেই মমতাময়ী সম্পর্কের প্রীতি । তাই বলা হয়েছে,”প্রযুক্তি দিয়েছে বেগ,কেড়ে নিয়েছে আবেগ।