জীবন সংগ্রামী নারী অটোরিক্সা চালক স্বপ্না

বুলবুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম সদর প্রতিনিধি::
‘এই নাগেশ্বরী ৩০ টাকা। একের পালি। ওঠেন সাটাম চলি যামো।’ অর্থাৎ একজন বাকী আছে, ওঠেন দ্রুত চলে যাবো। কুড়িগ্রাম শহরের ঘোষপাড়া এলাকায় নিজের অটোরিক্সার পাশে দাঁড়িয়ে এভাবে যাত্রীদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছিলেন নারী অটোচালক স্বপ্না রানী।
তখন দুপুরের তপ্ত রোদ। তার অটোরিক্সায় নারী ও পুরুষ মিলে তখন ৬ জন যাত্রী বসা। একটু পরেই পেয়ে গেলেন কাঙ্খিত যাত্রী। চালকের আসনে বসে স্বপ্না বেগম কুড়িগ্রাম শহর ছেড়ে যাত্রা শুরু করলেন নাগেশ্বরী উপজেলা সদরে। কোন জড়তা বা দ্বিধা নেই। হাসিমুখে থাকেন। এভাবেই গত ৩ বছর ধরে স্বপ্না অটোরিক্সা চালিয়ে সাফল্যের এক নতুন গল্প সৃষ্টি করছেন।
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে নতুন পথের সন্ধান দিয়েছেন এ সাহসী নারী। ১১ বছর যাবত স্বামী নিখোঁজ। নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের দিকদারি গ্রামে বাড়ি স্বপ্না রানী বর্মনের।
পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয়েছিল পাশের ফুলবাড়ী উপজেলার নগরাজপুর গ্রামে। ২৫ হাজার টাকা যৌতুক। স্বামী রতন চন্দ্র বর্মন ছিলেন রাজমিস্ত্রি। প্রায়ই যৌতুকের জন্য নির্যাতন করতো স্বামী রতন। বাধ্য হয়ে অভিযোগ করেন একটি বেসরকারি সংস্থার কাছে। আর এতেই স্বপ্নার জীবনে নেমে আসে মহা দুর্যোগ। মেয়ে রাধা রানী আর ৩ দিন সন্তান হৃদয় চন্দ্রকে রেখে স্বামী রতন হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ১১ বছর। আজো মেলেনি নিষ্ঠুর সেই স্বামীর সন্ধান।
স্বামী পলাতক হবার পরের দু’বছর অনেক কষ্টে দিনমজুরি করে সন্তান দু’টিকে বড় করছিলেন। কিন্তু স্বামীর অবর্তমানে শ্বশুরবাড়িতে টিকতে পারেননি। চলে এসেছেন দরিদ্র বাবার বাড়িতে।
৫ ভাইয়ের ভিটায় একটি ঘর তুলে ঠাঁই নিয়ে আছেন। বাবার ভিটেতে এসে শুরু হয় স্বপ্নার জীবন সংগ্রাম। পেটের ভাত জোগারের পাশাপাশি দু’সন্তানকে লেখাপড়া শেখানো কঠিন হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ভাঙা ঘরে আধপেটা খেয়ে কোনমতে দিনপার করেন। তারপরেও মনোবল না হারিয়ে নিজের পায়ে পথ চলা শুরু স্বপ্না।
রাজমিস্ত্রি থেকে শ্রমিক এমনকি দিনমজুরের কাজ করতে মাঠে ঘাঠে চষে বেড়িয়েছেন স্বপ্না। তারপরেও অভাবের দৈত্যটা তাকে নিত্য উপহাস করতো। ভয়কে জয় করে ঘুরে দাঁড়ার প্রত্যয় নিয়ে সামনে এগিয়ে যান একই নারী।
সাহসী নারী স্বপ্না জানান, দিনমজুরি করার সময় নানা ধরণের কাজ করতে হতো। এর মেধ্য মাটি কাটার কাজ করতে গিয়ে একটি প্রকল্পের সাথে যুক্ত হন। সেখানে রাস্তায় মাটি কাটার কাজ করতেন স্বপ্না।
‘স্বপ্ন’ নামের সেই প্রকল্পে দেড় বছর দৈনিক ৬ ঘন্টা কাজ করে ২শ টাকা মজুরি পেত। প্রকল্প থেকে কাজের পাশাপাশি নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে দেয়া হতো বিভিন্ন প্রশিক্ষণ।
স্বপ্না বলেন, ‘একদিন ডিসি সার আর ইউএনও সাব বললেন, তোমাদের মধ্যে কে আছো সাহসী, যে অটো চালাতে পারবে।’ কেউ হাত তোলেনি। আমি হাত তুললাম। তারপর আমাকে সাইকেল চালাতে দিল। সাইকেল চালানো শেখার পর ভিতরবন্দ চেয়ারম্যান আমাকে নিজ হাতে অটো চালানো শেখালেন।
প্রকল্প থেকে জমানো টাকা, সুদের উপর নেয়া ৩০ হাজার টাকা তুলে দিলাম ইউএনও সাবের হাতে। ওনারা আরো টাকা দিয়ে আমাকে একটি অটো কিনে দিলো। সেই থেকে প্রায় ৩ বছর ধরে রাস্তায় আছি।’ একজন স্বাভাবিক পুরুষের মতো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অনায়াসে অটোরিক্সা চালিয়ে ভাড়া খাটছে স্বপ্না। কুড়িগ্রাম থেকে নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, সোনাহাট, ভিতবন্দের পথে তাঁর অটো ছুটছে অবিরাম। এমনকি রংপুর শহরে প্রায়ই তাঁকে ছুটতে দেখা যায় রোগী নিয়ে। শহর কিংবা গ্রামের রাস্তায় দিব্বি অটো চালিয়ে বেড়ান।
স্বপ্না আরও জানান, দৈনিক ৮০০- ১০০০ টাকা আয় হয় অটোরিক্সা চালিয়ে। আয় ভালো হওয়ায় চড়া সুদে নেয়া দাদনের টাকা শোধ করেছেন। তার ১৪ বছরের মেয়ে রাধা রাণী পঞ্চম শ্রেণিতে পড়েন। ১১ বছরের ছেলে হৃদয় পড়েন প্রথম শ্রেণিতে। চরম অভাবের কারণে মাঝে লেখাপড়া বন্ধ হয়েছিল ছেলেমেয়ে দু’টোর, তাই লেখাপড়ায় খানিকটা পিছিয়ে পড়েছেন তা জানালেন স্বপ্না।
স্বপ্নার দু’সন্তান রাধারাণী ও হৃদয় জানান, তাদের মা সকালে উঠে খাবার তৈরি করে। সে নিজে খেয়ে সকাল ৮টার মধ্যেই বেড়িয়ে যায়। আসে রাত ৭-৮টার দিকে। তারাও পড়াশুনা শেষে স্কুলে চলে যান।
স্বপ্না জানান, প্রথম প্রথম কেই কেউ কটু মন্তব্য করলেও এখন তা করেন না। রাস্তায় কোন টিজিংয়ের শিকারও হতে হয়না তাকে। বলতে গেলে বিনা বাঁধায় তার কাজটি করতে পারছেনা। তাঁর অটোরিক্সায় এখন সব বয়সী যাত্রীরা ওঠেন। কারো কোন দ্বিধা বা সংকোচ নেই। অথচ শুরুর দিকে তিনি শুধু নারী যাত্রীদের অটোরিক্সায় নিতে চাইতেন। তার অটোরিক্সায় উঠতে নারীরাই বরং ভয় পেতো। যাত্রী হয়ে পুরুষরাই তাকে উৎসাহ আর সাহস জুগিয়েছে। এখন পুরুষ চালকদের সাথে পাল্লা দিয়ে সমান তালে পথ চলছেন; বরং পুরুষ চালকদের চেয়ে বেশী যাত্রীই পাচ্ছেন স্বপ্না। আর এভাবেই স্বপ্না স্বপ্নকে জয় করার পাশাপাশি একজন সাহসী ও সংগ্রামী নারীর প্রতিকৃতি হয়ে উঠেছেন।
পাটেশ্বরীর অটোযাত্রী মফিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথমে একটু অবাক হয়ে ছিলাম তার অটো চালানো দেখে। ভয়ে ভয়ে উঠতাম না তার অটোতে। কিন্তু যখন একজন পুরুষের মতো স্বাভাবিক নিয়মে অটো চালানো দেখে বলতে গেলে প্রায় নিয়মিত যাত্রী হয়ে গেছি।’
খাদের কিনার থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সাফল্যের দৃষ্টান্ত হওয়া স্বপ্না রানী তার স্বপ্নটাকে আরো বড় করতে চান। তিনি চান, তার সন্তান দুটিকে ভালোভাবে লেখাপড়া শিখিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে। বর্তমান আয় দিয়ে সংসারে অভাব দূর হলেও তেমন সঞ্চয় থাকেনা। যেটুকু থাকে তা জমিয়ে ভবিষ্যতে একটি পিকআপ কোনার স্বপ্ন দেখেন তিনি। পিকআপের ভাড়ার টাকায় তার সংসারের স্বচ্ছলতা আনতে চান জীবনজয়ী এই নারী।
স্বপ্নার গল্পটা তার গ্রাম ছাড়িয়ে ছড়িয়েছে অনেক দূর। নারীরা যারা চালকের আসনে বসারটাকে অসম্ভব মনে করতো। এখন অনেকের মনে সেই সম্ভাবনা উঁকি দিতে শুরু করেছে।
স্বপ্নার বড় ভাই নারায়ণ বলেন, ‘শত বিপদে মনোবল হারাননি আমার বোন। সংগ্রাম করে জীবন কাটছে তার। তাই সবাই তাকে পছন্দ করে। নাগেশ্বরীর ইউএনও তাকে একটি ঘর করে দেয় আমার লিখে দেয়া ৩ শতক জমিতে। ওখানেই বর্তমানে স্বপ্না পরিশ্রম করে ভালভাবেই দিন পার করছে।
স্বপ্নার প্রতিবেশি শেফালী এবং কৃষ্ণ চন্দ্র জানান, ভিতরবন্দ ইউনিয়ন এখন স্বপ্নার নামেই পরিচিতি পাচ্ছে বেশি। স্বপ্না অটোরিক্সা চালালেও লোকাল ভাড়া কম খাটেন। বেশির ভাগ রোগী নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ কিংবা বেসরকারি ক্লিনিক গুলোতে যায়। তাতে রোগীদের অনেক সুবিধা হয়েছে।
ভিতরবন্দ ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম জানান, তিনি নিজে স্বপ্নাকে অটো চালানো শিখিয়েছেন। স্বপ্না দেখিয়েছে, অটো চালানো কোন কঠিন কাজ নয়। বরং যে কোন কাজে নারীদের চ্যালেঞ্জ নেয় উচিৎ।