ফুলবাড়ীর ঐহিত্যবাহী ৫০০ বছরের বিশালাকার শিমুল গাছ

রতি কান্ত রায়, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি::
দেখতে অনেকটা জাতীয় স্মৃতিসৌধের মতো। তার উপর বয়স প্রায় ৫০০ বছর। দৃষ্টিনন্দন প্রাচীন এই গাছটিকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে নানা কল্প কাহিনী। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী কুঠি চন্দ্রখানা গ্রামের এই বিশালাকারের অভিনব শিমুল গাছটি দেখে অভিভূত হন কৌতুহলী মানুষ।
ফুলবাড়ী উপজেলা সদর থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে কুটিচন্দ্রখানা গ্রামে এ গাছটির অবস্থান। ৮ শতাংশ জমির উপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ১৫০ ফুট লম্বা শিমুল গাছটির গোড়ার পরিধি ৫০ ফুটেরও বেশী। পেছন দিকটায় ঝোপঝাড়ে পূর্ণ। আর সামনে বিষ্ময়! বিশালাকৃতির এ গাছটির কাছে গেলেই মনে হবে যেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে প্রকৃতি বিপুল আবেগ দিয়ে তৈরী করেছেন আর একটি দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিসৌধ। গাছের গোড়ায় দাঁড়ালে নিজেকে উচ্চতার দিক থেকে অতিক্ষুদ্র মনে হয়। আবার কখনও বা হয় পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভব। কখনও বিশালতায় ভরে যায় মন। তখন মুদ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে যায় দর্শনার্থীদের মনে। আলোচিত এই গাছটি দেখতে তাই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন অনেকে। পহেলা বৈশাখে মেলা বসে এখানে।
ফুলবাড়ীর জসিমিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো: আমিনুল ইসলাম জানান, দেখতে স্মৃতিসৌধের মতো বলে এর সাথে আবেগ জড়িয়ে আছে স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের। তাই বাঙালির উৎসবগুলোতে এখানে আয়োজন করা হয় মেলাসহ নানা উৎসবের। গাছটি দেখতে আসা ঢাকার স্টুডেন্ট কেয়ার হাইস্কুলের সিনিয়র শিক্ষক আযমগীর হাসিবুর রহমান জানান, তিনি আশ্চর্যজনক বিশালাকৃতির গাছটি দেখে অভিভূত হয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের অনেক স্থানে বেড়িয়েছেন কিন্তু এমন দৃষ্টি নন্দন গাছ কোথাও দেখেননি। তিনি বলেন, এ গাছটি নিয়ে মিডিয়ার প্রচার হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নজর কাড়বে। একই কথা জানালেন পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা থেকে আসা যুবক খালেদ মাসুদ, ভুরুঙ্গামারী থেকে আসা যুবক জহুরুল ইসলামসহ আরও অনেকে।
গাছটিকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে নানা কল্পকাহিনী। অনেকে মনে করেন, গাছটিতে দেব-দেবীর আসন আছে। আবার অনেকে মনে করেন গাছের গোড়ায় গুপ্তধন আছে। বিশালাকারের একটি সাপ দেখা যায় মাছে মধ্যে, গাছে কোপ বা ঢিল দিলে রক্ত বের হয় -এ ধরণের কল্পকাহিনী ছড়িয়ে রয়েছে এলাকায়। এলাকাবাসী তা বিশ্বাসও করেন।
এই গ্রামের বৃদ্ধ বাহার আলী বলেন, ‘ছোটবেলায় খেলতে গিয়ে গাছে ঢিল দিয়ে দেখি গাছের গা দিয়ে রক্ত পড়ছে। তারপর বাবাকে জিঙ্গেস করলে তিনি ঢিল দিলে বড় ক্ষতি হবে বলে জানান’। গাছের পাশ্ববর্তী বাড়ি মজিবর রহমানের। তিনি জানান, গাছ কেনার জন্য একবার পাইকারকে সহায়তা করেছেন বলে বেশ কিছুদিন প্রতিরাতে তার রাস্তা ভুল হতো। সারা রাত ঘুরেও বাড়ির পথ পেতেন না। তিনি মাঝে মধ্যে গাছের গোড়ায় একটি বৃহৎ আকারের সাপ দেখতে পান বলে জানান।
এলাকার প্রবীন লোকজনের ধারণা গাছটির বয়স কমপক্ষে ৫০০ বছর হবে। কুঠিচন্দ্রখানা গ্রামের ১১৬ বৃদ্ধ আফছার আলী জামালপুরি জানান, তিনি যুবক বয়সে থাকাকালে তৎকালিন কুটিচন্দ্রখানা গ্রামের সর্বোচ্চ বয়স্ক বৃদ্ধ খোকা চন্দ্র বর্ম্মনের কাছে শুনেছেন, খোকা বর্মনের দাদা তার দাদার সমায়ও তারা গাছটিকে বর্তমান যেমন ঠিক তেমনি দেখেছেন। এতে তার ধারনা শিমুলগাছটির বয়স ৫’শ বছরের বেশি হবে। একই ধারণা ৮৫ বছর বয়সের বৃদ্ধা মোহিনী বালা, ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধা সেনেকা বর্ম্মন, ৬০ বছর বয়সী একাব্বর আলী, ২৫ বছরের যুবক আশিষ কুমারসহ অনেকের। গাছটির পাশে বসবাসকারী একাব্বর আলী (৬০) জানান, শিমুলগাছটি আগের চেয়ে দিন দিন আরো তাজা হচ্ছে। এ গাছে মৌমাছির চাকসহ, বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বাস। এ গাছটি টিয়া পাখির অভয়াশ্রম। বিকাল হলেই টিয়া পাখিসহ বিভিন্ন পাখির কলরবে মুখর হয়ে হয়ে গাছের শাখাগুলো।
গাছটির জমির মালিক কিরন চন্দ্র জানান, একবার এ গাছটি ১০ হাজার টাকা মূল্যে বিক্রি করে তার বাবা কোকন চন্দ্র স্বপ্নে গাছটির অলৈৗকিক ক্ষমতা দেখে বাধ্য হয়ে গাছটির বিক্রিত টাকা পাইকারকে ফেরত দেন। তাই বংশ পরম্পরায় এই গাছ সংরক্ষণের ইচ্ছে আছে তার।
দর্শনার্থীদের টানতে এলাকাবাসী বিশালাকৃতির দৃষ্টিনন্দন এ গাছটি সম্পর্কে প্রচারণা ও মুল রাস্তা থেকে গাছের গোড়া পর্যন্ত সংযোগ সড়ক তৈরীর দাবী জানিয়েছেন। গত বৈশাখী মেলার সময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাস্তা নির্মাণের আশ্বাসও দিয়েছেন বলে জানান তারা।